চলতি বছরে বড় ধরনের অবমূল্যায়নের পথে রয়েছে ডলার। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) আরো অন্তত দুই দফায় সুদহার কমাতে পারে। সুদহার কমানোর ধাপ শেষ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে বেশিরভাগ বৃহৎ অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকও। এ ভিন্নমুখী প্রত্যাশার প্রভাবে ২০১৭ সালের পর সবচেয়ে বড় পতনের দিকে এগোচ্ছে ডলারের বিনিময় হার। খবর রয়টার্স।
এশিয়ার মুদ্রাবাজারে গতকাল ডলারের বিনিময় হার ছিল নিম্নমুখী। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জিডিপির তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হলেও সুদহার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। তারা প্রত্যাশা করছেন, ২০২৬ সালে ফেড দুই দফায় সুদহার কমাতে পারে। এমন প্রত্যাশার কারণে ডলারের বিনিময় হার আরো দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিনিয়োগকারীরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ ডেভিড মেরিকল বলেন, ‘আমরা আশা করছি যে ফেডের নীতিনির্ধারণী কমিটি ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি আগামী দিনে দুই দফায় সুদহার কমাতে পারে। প্রতিবার সুদহার কমানো হতে পারে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে। এতে সুদহার নেমে আসতে পারে ৩ থেকে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের মধ্যে। সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা এখন আরো কাটছাঁটের দিকেই বেশি রয়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসছে। এ প্রবণতাকেই আমরা পূর্বাভাসের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখছি।’
প্রধান কয়েকটি মুদ্রা নিয়ে গঠিত বাস্কেটে ডলারের অবস্থান নির্দেশক সূচক গতকাল নেমে আসে ৯৭ দশমিক ৭৬৭-তে, যা আড়াই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি বছরে সূচকটি কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। বছরের শেষ সপ্তাহে আরো কমলে ২০২৫ সালে ডলারের মোট অবমূল্যায়নের হার দাঁড়াতে পারে ২০০৩ সালের পর সর্বোচ্চে।
চলতি বছর ডলারের জন্য পরিস্থিতি ছিল বেশ অনিশ্চিত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার শুল্কনীতি পরিবর্তন এবং ফেডের সিদ্ধান্তে তার প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর ফলে মার্কিন সম্পদে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করছেন তারা। এ অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা ডলারের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন।
চলতি বছরে ডলারের বিপরীতে ইউরোর বিনিময় হার ১৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে ইউরোর বিনিময় হারও ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধির পথে রয়েছে। গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার অপরিবর্তিত রাখে। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কিছু পূর্বাভাস বাড়ানো হয়। এতে অদূর ভবিষ্যতে সুদহার কমানোর সম্ভাবনা কমেছে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে পরবর্তী নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে সুদহার বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এর প্রভাবে চলতি বছরে অস্ট্রেলীয় ডলারের বিনিময় হার বেড়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে নিউজিল্যান্ড ডলারের বিনিময় হারও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এদিকে চলতি বছরে পাউন্ডের বিনিময় হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ শতাংশের বেশি। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে অন্তত একবার সুদহার কমাতে পারে।
বর্তমানে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজার সংশ্লিষ্টদের নজর প্রধানত ইয়েনের দিকে নিবদ্ধ। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার দ্রুত কমে যাওয়ায় জাপান সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাটায়ামা বলেন, ইয়েনের বিনিময় হার যদি বেশি কমে যায়, তাহলে ব্যবস্থা নেয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে টোকিওর।
তার এ বক্তব্যের পর ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার কিছুটা বেড়েছে।
গত শুক্রবার ব্যাংক অব জাপান সুদহার বাড়ালেও গভর্নর কাজুও উয়েদার বক্তব্য প্রত্যাশার তুলনায় কম কড়াকড়ি ছিল। ফলে ইয়েন আবার চাপের মুখে পড়ে। বছরের শেষ দিকে লেনদেন কমে আসায় সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ঝুঁকি আরো বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।